
যমযম পানি মক্কার মসজিদুল হারামের কাছে অবস্থিত কূপের পানি। মুসলিমদের কাছে এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, কারণ এটি হযরত হাজেরা (আ.) ও শিশু ইসমাঈল (আ.)-এর ঘটনার সঙ্গে জড়িত। হজ ও উমরাহ থেকে ফেরার সময় অনেকেই যমযম নিয়ে আসেন। যমযম পানির ফজিলত নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। এই লেখায় যমযম পানির ফজিলত, পান করার আদব ও দোয়া, জমজম কূপের পরিচিতি এবং বাড়িতে নিয়ে আসার সাধারণ নিয়ম সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
যমযমের ইতিহাস
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে হাজেরা (আ.) ও শিশু ইসমাঈল (আ.)-কে মক্কার নির্জন উপত্যকায় রেখে যান। পানির খোঁজে হাজেরা (আ.) সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ান। এরপর আল্লাহর কুদরতে ইসমাঈল (আ.)-এর পায়ের কাছে পানির ধারা প্রবাহিত হয়। এটিই যমযম। সাফা-মারওয়ার সাঈ সেই ঘটনারই স্মারক।
যমযম পানির ফজিলত
- হাদিসে এসেছে, যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সে উদ্দেশ্যই পূরণ হয় (ইবনে মাজাহ)। এ কারণে পান করার সময় ভালো নিয়ত করা উত্তম।
- নবী (সা.) যমযম পান করেছেন এবং তা থেকে বরকত নিয়েছেন।
- যমযম বরকত ও বিশ্বাসের বিষয়, তাই এটিকে চিকিৎসার বিকল্প মনে করা ঠিক নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
যমযম পানি পান করার নিয়ম ও আদব
- বিসমিল্লাহ বলে শুরু করুন।
- সম্ভব হলে কিবলামুখী হয়ে পান করুন।
- তিন নিঃশ্বাসে পান করুন এবং পেট ভরে পান করার চেষ্টা করুন।
- পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলুন এবং নিজের জন্য, পরিবারের জন্য দোয়া করুন।
পান করার দোয়া
বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস (রা.) যমযম পান করার সময় বলতেন: “আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইলমান নাফিআন, ওয়া রিযকান ওয়াসিআন, ওয়া শিফাআম মিন কুল্লি দা-য়িন।” অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সব রোগ থেকে আরোগ্য চাই। এছাড়া নিজের ভাষায় যে কোনো ভালো দোয়া করা যায়।
জমজম কূপ ও যমযম পানির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
জমজম কূপ কাবা শরীফের অতি কাছেই অবস্থিত। আরবি নামের উচ্চারণ ও বাংলা বানানের ভিন্নতার কারণে কেউ লেখেন যমযম, কেউ জমজম; দুটি বানানই একই পানি বোঝায়। বর্তমানে মুসল্লিরা সরাসরি কূপ থেকে নয়, মসজিদুল হারামে স্থাপিত নির্ধারিত ডিসপেনসার ও কনটেইনার থেকে পানি পান করেন।
মসজিদুল হারাম ও মদিনায় যমযম
মসজিদুল হারামে প্রচুর যমযম পানির ব্যবস্থা থাকে। মসজিদে নববীতেও যমযমের ঠান্ডা ও সাধারণ পানির ব্যবস্থা পাওয়া যায়। প্রতিবার পান করার সময় ভিড় এড়িয়ে নির্ধারিত স্থান থেকে পান করুন এবং পানির অপচয় করবেন না।
দেশে নিয়ে আসার নিয়ম
হজ ও উমরাহ যাত্রীরা সাধারণত নির্ধারিত পরিমাণ যমযম নিয়ে ফেরেন। সৌদি আরব ও বিমান সংস্থা প্রায়ই এর পরিমাণ ও প্যাকেজিং নিয়ে নির্দেশনা দেয়, যা বছর ও সংস্থা ভেদে পরিবর্তন হতে পারে। তাই ফেরার আগে আপনার এজেন্সি ও বিমান সংস্থা থেকে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন। পরিবহনের জন্য অনুমোদিত, ভালোভাবে সিল করা ও লিকপ্রুফ কনটেইনার ব্যবহার করা ভালো। লাগেজের ওজন সীমার কথাও মাথায় রাখুন।
যমযম পানি দেশে আনার ধাপ
- এজেন্সিকে জিজ্ঞাসা করুন: ফেরার কয়েক দিন আগে আপনার এজেন্সি ও বিমান সংস্থার কাছ থেকে যমযমের পরিমাণ ও প্যাকেজিংয়ের সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন।
- অনুমোদিত কনটেইনার নিন: ঢাকনা শক্ত, সিল করা ও লিকপ্রুফ কনটেইনার ব্যবহার করুন। সাধারণত তরল পদার্থের ক্ষেত্রে হ্যান্ড ব্যাগে সীমা থাকে, তাই বড় কনটেইনার চেকড লাগেজে দিতে হয়।
- ভালোভাবে মুড়িয়ে রাখুন: কনটেইনারের চারপাশে নরম কাপড় বা প্যাডিং দিন, যেন ঝাঁকুনিতে না ফাটে।
- লাগেজের ওজন হিসাব করুন: যমযমের ওজন লাগেজের মোট সীমার মধ্যে ধরতে হবে, তাই অন্য জিনিস কমিয়ে পরিকল্পনা করুন।
- দেশে পৌঁছে সংরক্ষণ করুন: সরাসরি রোদ থেকে দূরে, ঠান্ডা ও পরিষ্কার জায়গায় রাখুন।
যমযম পানি উপহার দেওয়ার সময় কী খেয়াল রাখবেন
দেশে ফিরে আত্মীয়স্বজনকে যমযম উপহার দেওয়া সুন্দর একটি প্রথা। তবে বড় কনটেইনার থেকে ছোট বোতলে ভাগ করার সময় পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করুন এবং হাত ধুয়ে নিন। সবাইকে অল্প অল্প করে দিলে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, আর কেউ যেন অপচয় না করেন সে বিষয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দিন।
যমযম পানি নিয়ে সাধারণ ভুল
- দুর্বল বা পুরোনো বোতলে পানি ভরা, যা পথে লিক করে অন্য জিনিস নষ্ট করে।
- অতিরিক্ত পরিমাণ নেওয়ার চেষ্টা করে লাগেজের ওজন সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া।
- পান করার সময় শুধু অভ্যাসবশত পান করা, ভালো নিয়ত বা দোয়া ভুলে যাওয়া।
- গরম গাড়িতে বা রোদে বোতল ফেলে রাখা।
- পানির অপচয় করা, বিশেষ করে ভিড়ের স্থানে ঢালাঢালি করা।
উমরাহ বা হজের সফরে যমযম নেওয়ার প্রস্তুতি আগে থেকে ঠিক করে রাখলে ফেরার সময় ঝামেলা কমে। আপনি যদি আমাদের সঙ্গে যেতে চান, তাহলে চলমান উমরাহ প্যাকেজ নভেম্বর ২০২৬ স্ট্যান্ডার্ড বা হজ প্যাকেজ ২০২৭ দেখতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন
দাঁড়িয়ে যমযম পান করা যাবে কি? সাধারণ অবস্থায় বসে পান করা সুন্নত। তবে যমযম দাঁড়িয়ে পান করার বর্ণনাও রয়েছে, তাই উভয় অবস্থায়ই পান করা যায়। এ বিষয়ে আলেমদের মত ভিন্ন, তাই নিজের আলেমের পরামর্শ নিন।
ইহরাম অবস্থায় যমযম পান করা যাবে কি? হ্যাঁ, কোনো সমস্যা নেই।
যমযম কি নষ্ট হয়? বন্ধ ও পরিষ্কার পাত্রে রাখলে সাধারণত দীর্ঘদিন ভালো থাকে, তবে ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন।
যমযম বানান কোনটি ঠিক, যমযম না জমজম? আরবি শব্দের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণে দুটি রূপই চলে। অর্থ ও পানি একই, তাই যে বানানে পরিচিত সেটি ব্যবহার করতে পারেন।
যমযম পানি দেশে কতটুকু আনা যায়? পরিমাণের সীমা সৌদি কর্তৃপক্ষ ও বিমান সংস্থা নির্ধারণ করে এবং তা বদলাতে পারে। ফেরার আগে এজেন্সির কাছ থেকে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন।
যমযম পানি পান করার সময় কী দোয়া করব? ওপরের দোয়াটি পড়তে পারেন, অথবা নিজের ভাষায় দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করুন।
লেখক: নাজমুস শাকেব, ম্যানেজিং পার্টনার, আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (হজ লাইসেন্স HL ৬২৫)। মক্কায় বেড়ে ওঠা, ঢাকা থেকে হজ-উমরাহ যাত্রীদের সেবায় যুক্ত। আমাদের সম্পর্কে
দ্রষ্টব্য: এটি সাধারণ নির্দেশনা। নির্দিষ্ট মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা হজ গাইডের পরামর্শ নিন। স্বাস্থ্য বিষয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। দাবিত্যাগ
আল-সাফওয়া (HL ৬২৫) — যোগাযোগ
নাজমুস শাকেব: 01714-075291 | 01974-075291
হানিফ: 01670-787633 | 01919-787633
অফিস: 01552-600854