
হজের সময় মক্কা-মদিনায় প্রচণ্ড গরম, বিশাল ভিড় এবং দিনে কয়েক কিলোমিটার হাঁটা লাগে। যাত্রার আগে কিছু প্রস্তুতি নিলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে। হজে সুস্থ থাকার উপায় জানা থাকলে ইবাদতে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। এই লেখায় যাওয়ার আগে, মক্কা-মদিনায় এবং মিনা-আরাফাতে সুস্থ থাকার ব্যবহারিক টিপস, সাধারণ ভুল এবং প্রশ্নোত্তর দেওয়া হলো।
যাওয়ার আগে করণীয়
- টিকা: সৌদি আরব হজ ভিসার জন্য মেনিনজাইটিসের (Meningococcal) টিকা বাধ্যতামূলক করেছে। অন্য টিকা (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা) লাগবে কি না, তা প্রতি বছর সরকারি নির্দেশনায় জানানো হয়, তাই হজ ব্যবস্থাপনা ও এজেন্সির ঘোষণা দেখে নিন।
- ডাক্তারের পরামর্শ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা শ্বাসকষ্ট থাকলে যাত্রার কয়েক মাস আগে চিকিৎসককে দেখান। নিয়মিত ওষুধের পুরো সময়ের মজুদ ও প্রেসক্রিপশনের কপি সঙ্গে রাখুন।
- হাঁটার অভ্যাস: হজের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে প্রতিদিন ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটুন। তাওয়াফ, সাঈ ও জামারাতে হাঁটার জন্য শরীর তৈরি থাকবে।
- জুতা ও পোশাক: আরামদায়ক, আগে পরা জুতা নিন। নতুন জুতায় পায়ে ফোসকা পড়তে পারে।
গরম ও পানিশূন্যতা থেকে বাঁচার উপায়
| সমস্যা | প্রতিরোধ ও করণীয় |
|---|---|
| পানিশূন্যতা | পিপাসা না লাগলেও নিয়মিত পানি পান করুন; প্রস্রাবের রং হালকা আছে কি না খেয়াল রাখুন |
| হিট স্ট্রোক | দুপুরের কড়া রোদ এড়ান, ছাতা ব্যবহার করুন, মাথা ঘুরলে বা বমি ভাব হলে ছায়ায় বসে পানি পান করে সাহায্য চান |
| পায়ে ফোসকা ও ঘা | নরম মোজা বা ক্রিম, শুকনো পা রাখা, ভেজা জুতা না পরা |
| সর্দি-কাশি ও ফ্লু | ভিড়ে মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়া, অন্যের সঙ্গে খাবার-পানি ভাগাভাগি এড়ানো |
| পেটের সমস্যা | খোলা বা বাসি খাবার এড়ান, বিশুদ্ধ পানি ও প্যাকেটজাত খাবারকে প্রাধান্য দিন |
সঙ্গে রাখার ওষুধ ও জিনিস
- নিয়মিত সেবনের ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন
- জ্বর-ব্যথার সাধারণ ওষুধ, ওরাল স্যালাইন, গ্যাসের ওষুধ
- ব্যান্ডেজ, ফোসকার প্লাস্টার, ঠান্ডার ক্রিম
- মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সানস্ক্রিন লোশন (ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধিমুক্ত)
সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী কিছু ওষুধ নিয়ন্ত্রিত। বিশেষ করে ঘুমের বা ব্যথানাশক কিছু ওষুধ সঙ্গে নেওয়ার আগে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ও ইংরেজিতে লেখা বিবরণ রাখুন।
মিনা ও আরাফাতে বিশেষ সতর্কতা
মিনায় তাঁবুতে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকেন, তাই ছোঁয়াচে রোগের ঝুঁকি বেশি। আরাফাতের দিনে দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে থাকতে হয়, তাই পর্যাপ্ত পানি ও ছাতা নিয়ে রাখুন। জামারাতে ভিড়ের সময় এড়িয়ে হালকা ভিড়ের সময় বেছে নেওয়া নিরাপদ, এ বিষয়ে আপনার গ্রুপ লিডারের পরামর্শ মেনে চলুন।
বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য পরামর্শ
বয়স্ক যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ার বা গাড়ির ব্যবস্থা আগেই জেনে রাখুন। দীর্ঘ সময় না হেঁটে কম ভিড়ের সময়ে ইবাদত সারা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকা জরুরি। শরীর খারাপ লাগলে দ্রুত গ্রুপ লিডার বা মেডিকেল দলকে জানান।
হজে সুস্থ থাকার উপায়: প্রতিদিনের সহজ অভ্যাস
বড় প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রতিদিনের ছোট অভ্যাসই হজে সুস্থ থাকার আসল চাবিকাঠি। নিচের ধাপগুলো মেনে চললে ক্লান্তি ও অসুস্থতার ঝুঁকি কমে।
- ঘুম ও বিশ্রামের সময় ঠিক রাখুন: তাওয়াফ বা সাঈ শেষে হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। টানা জেগে থাকলে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়।
- ভিড়ের সময় এড়িয়ে চলুন: সম্ভব হলে নামাজের ঠিক আগে-পরের চরম ভিড় বাদ দিয়ে তুলনামূলক ফাঁকা সময়ে তাওয়াফ ও সাঈ করুন।
- পানি ও হালকা খাবার: সঙ্গে ছোট পানির বোতল রাখুন এবং ভারী, তেলযুক্ত খাবারের বদলে সহজপাচ্য খাবার বেছে নিন।
- হাত পরিষ্কার রাখুন: খাওয়ার আগে ও ভিড় থেকে ফিরে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন।
- শরীরের সংকেত অগ্রাহ্য করবেন না: মাথা ঘোরা, বুকে চাপ বা অতিরিক্ত দুর্বলতা মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে সাহায্য চান।
হজে অসুস্থ হওয়ার সাধারণ ভুল
- পিপাসা না লাগা পর্যন্ত পানি পান না করা।
- দুপুরের কড়া রোদে অপ্রয়োজনে বাইরে হাঁটা।
- নতুন জুতা বা অপরিচিত স্যান্ডেল পরে দীর্ঘ পথ হাঁটা।
- প্রয়োজনীয় ওষুধ চেক-ইন লাগেজে রেখে দেওয়া, ফলে সময়মতো হাতের কাছে না পাওয়া।
- সুস্থ বোধ করলে নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া।
- অন্যের ওষুধ বা বাজারের অচেনা ওষুধ নিজে থেকে খাওয়া।
টিকা, ওষুধ ও কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন
সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সব হাজির জন্য মেনিনজাইটিসের টিকা বাধ্যতামূলক এবং মৌসুমি ফ্লুর টিকা সুপারিশ করা হয়ে থাকে। তবে নিয়ম প্রতি বছর হালনাগাদ হয়, তাই যাত্রার আগে সর্বশেষ ঘোষণা দেখে নিন। টিকার সনদ সাবধানে রাখুন। ওষুধ মূল প্যাকেটে এবং হাতের ব্যাগে রাখুন, সঙ্গে রোগের বিবরণ ও প্রেসক্রিপশনের কপি রাখুন।
মনে রাখবেন, সুস্থ থাকা মানে ইবাদতকে সহজ করা। শরীরের উপর বাড়তি চাপ নিয়ে সব কাজ একদিনে সারতে যাওয়ার চেয়ে ধীরেসুস্থে করা অনেক ভালো। আল-সাফওয়ার গ্রুপে যাঁরা যান, তাঁদের গাইড এই বিষয়ে প্রয়োজনে পরামর্শ দেন, তবে সিদ্ধান্ত সবসময় নিজের শরীরের অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিন।
সাধারণ প্রশ্ন
ডায়াবেটিস থাকলে কি হজে যাওয়া যায়? সাধারণত যান, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ, ইনসুলিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা জরুরি। এ বিষয়ে ডাক্তারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
ইহরামে মাস্ক বা ওষুধ ব্যবহার করা যাবে কি? প্রয়োজনে সুগন্ধিমুক্ত ওষুধ ও সাধারণ মাস্ক নিয়ে মাসআলা জেনে নিন। ইহরাম অবস্থায় নারীরা এমন নিকাব ব্যবহার করবেন না যা মুখে লেগে থাকে। বিস্তারিত জানতে হজে যা নিতে হবে ও ইহরাম গাইড দেখুন।
হজে গরমে কীভাবে সুস্থ থাকব? নিয়মিত অল্প অল্প করে পানি পান করুন, ছাতা ও হালকা পোশাক ব্যবহার করুন এবং দুপুরের চরম গরমে অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকুন।
হজের টিকা কখন নেওয়া উচিত? যাত্রার অন্তত কয়েক সপ্তাহ আগে নিয়ে নেওয়া নিরাপদ। নির্দিষ্ট সময়সীমা এজেন্সি ও চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
হজে সাধারণত কোন সমস্যাগুলো বেশি হয়? পানিশূন্যতা, সর্দি-কাশি, পেটের সমস্যা ও পায়ে ঘা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এসবের বেশিরভাগই আগাম সতর্কতায় এড়ানো যায়।
ওষুধ কোথায় রাখব? প্রয়োজনীয় ওষুধ মূল প্যাকেটে হাতের ব্যাগে রাখুন, যেন বিমানবন্দরে ও পথে সহজে পাওয়া যায়।
- হজে যা নিতে হবে: সম্পূর্ণ তালিকা
- হজ ২০২৭ স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজ
- বেসরকারি হজ প্যাকেজ ২০২৭
- মিনা-আরাফাত-মুজদালিফা গাইড
- হজ প্রশিক্ষণ ২০২৭
লেখক: নাজমুস শাকেব, ম্যানেজিং পার্টনার, আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (হজ লাইসেন্স HL ৬২৫)। মক্কায় বেড়ে ওঠা, ঢাকা থেকে হজ-উমরাহ যাত্রীদের সেবায় যুক্ত। আমাদের সম্পর্কে
দ্রষ্টব্য: এটি সাধারণ নির্দেশনা। নির্দিষ্ট মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা হজ গাইডের পরামর্শ নিন। স্বাস্থ্য বিষয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। দাবিত্যাগ
আল-সাফওয়া (HL ৬২৫) — যোগাযোগ
নাজমুস শাকেব: 01714-075291 | 01974-075291
হানিফ: 01670-787633 | 01919-787633
অফিস: 01552-600854