
হজ ও উমরাহ শুধু শারীরিক সফর নয়, এটি আল্লাহর সাথে কথা বলার সফর। প্রতিটি ধাপে কোন দোয়া পড়া সুন্নত বা প্রচলিত, তা জানা থাকলে ইবাদতে মন বসে সহজে। তবে একটি কথা শুরুতেই মনে রাখুন: হজ বা উমরাহর অধিকাংশ ধাপের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। কুরআন-হাদিসে যেসব দোয়ার স্পষ্ট উল্লেখ আছে সেগুলো পড়া উত্তম, আর বাকি সময় নিজের ভাষায়, নিজের মনের কথা আল্লাহর কাছে বলাও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য। আরবি মুখস্থ নেই বলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই লেখায় পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য দোয়াগুলো বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ সাজানো হলো।
যাত্রার শুরুতে: সফরের দোয়া
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ও বিমানে বা গাড়িতে ওঠার সময় কুরআনে বর্ণিত এই দোয়া পড়া হয়:
আরবি: سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাযি সাখখারা লানা হাযা ওয়ামা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন।
অর্থ: “পবিত্র তিনি, যিনি এটিকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে বশ করতে সক্ষম ছিলাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের রবের কাছে ফিরে যাব।” (সূরা যুখরুফ: ১৩-১৪)
ইহরামের নিয়ত ও তালবিয়া
ইহরাম বাঁধার সময় উমরাহর জন্য “লাব্বাইকা উমরাতান” এবং হজের জন্য “লাব্বাইকা হাজ্জান” বলে নিয়ত করা হয়। এরপর শুরু হয় তালবিয়া, যা হজ ও উমরাহর সবচেয়ে পরিচিত ধ্বনি।
আরবি: لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি হাজির, আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা ও নিয়ামত আপনারই, রাজত্বও আপনার, আপনার কোনো শরিক নেই।”
উমরাহকারী তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত এবং হজকারী ১০ জিলহজ বড় জামারায় কঙ্কর মারা শুরু করার আগ পর্যন্ত তালবিয়া পড়েন। পুরুষরা উচ্চস্বরে পড়েন, নারীরা নিচু স্বরে।
মসজিদুল হারামে প্রবেশের দোয়া
মসজিদে প্রবেশের সাধারণ সুন্নত হলো ডান পা আগে দিয়ে দরুদ পড়া এবং এই দোয়া বলা:
আরবি: اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাফতাহ লী আবওয়াবা রাহমাতিক।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন।”
কাবা শরিফ প্রথম দেখার মুহূর্তে হাত তুলে নিজের মনের সব চাওয়া আল্লাহর কাছে পেশ করুন। আলেমগণ বলেন, এই সময়ের দোয়া কবুলের আশা করা যায়।
তাওয়াফের দোয়া
হাজরে আসওয়াদ বরাবর এসে ইশারা করার সময় বলা হয়: “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” (আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সর্বমহান)। তাওয়াফের প্রতিটি চক্করে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়; কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, দরুদ ও নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়। তবে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে হাদিস অনুযায়ী এই দোয়া পড়ার প্রচলন আছে:
আরবি: رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আযাবান্নার।
অর্থ: “হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা বাকারা: ২০১)
তাওয়াফের নিয়ম বিস্তারিত জানতে পড়ুন তাওয়াফ সম্পূর্ণ গাইড।
সাফা ও মারওয়ায় দোয়া
সাঈ শুরুর সময় সাফার কাছে গিয়ে সূরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াতের অংশ পড়া সুন্নত: “ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা’আইরিল্লাহ” (নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত)। এরপর কাবার দিকে মুখ করে হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করা হয়।
আরবি: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত নবীজি (সা.)-এর হজের বিবরণ অনুযায়ী তিনি সাফায় এই বাক্য তিনবার বলে মাঝে দোয়া করেছেন। সাঈয়ের ধাপগুলো দেখুন সাফা মারওয়া সাঈ গাইড লেখায়।
আরাফার দিনের দোয়া
আরাফার ময়দানে নির্দিষ্ট কোনো একটি দোয়া ফরজ নয়। হাদিসে আরাফার দিনের দোয়াকে উত্তম দোয়া বলা হয়েছে এবং তাওহিদের কালেমা, তাসবিহ, ইস্তিগফার ও দরুদ বেশি করে পড়ার কথা এসেছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনে আল্লাহ বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তাই এই দিনে নিজের গুনাহের জন্য কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাওয়াই মূল কাজ। আদম (আ.)-এর দোয়াটি এ সময় পড়া যায়:
আরবি: رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণ: রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থ: “হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর যুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।” (সূরা আ’রাফ: ২৩)
আরাফায় নিজের, পরিবারের, বাবা-মায়ের, দেশের ও সমগ্র উম্মাহর জন্য আলাদা আলাদা করে দোয়া করার একটি তালিকা আগে থেকে মনে রেখে যান।
মুজদালিফা ও জামারাতের দোয়া
মুজদালিফায় ফজরের পর কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর যিকির ও দোয়া করা হয়; কুরআনে এ স্থানে আল্লাহকে স্মরণের নির্দেশ এসেছে। জামারায় প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় “আল্লাহু আকবার” বলা হয়। ছোট ও মধ্যম জামারায় কঙ্কর মারার পর কিবলামুখী হয়ে কিছুক্ষণ হাত তুলে দোয়া করা সুন্নত, তবে বড় জামারার পর দোয়ার জন্য দাঁড়ানো হয় না।
যমযম পান ও রওজায় সালাম
যমযম পান করার সময় বিসমিল্লাহ বলে, সম্ভব হলে কিবলামুখী হয়ে, পান শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা ভালো। এরপর নিজের জন্য যা চান, সেটির জন্য দোয়া করুন। এ বিষয়ে কিছু দোয়া বহুল প্রচলিত হলেও সেগুলোর সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে, তাই নির্দিষ্ট শব্দ মুখস্থ করাকে বাধ্যতামূলক মনে করবেন না। যেকোনো ভাষায় সহজভাবে চাইলেই চলে।
মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজার সামনে নিচু স্বরে, বিনয়ের সাথে সালাম দেওয়া হয়:
উচ্চারণ: আস-সালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
অর্থ: “হে নবী, আপনার ওপর শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।”
একইভাবে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-কেও সালাম দেওয়া যায়। সেখানে ভিড় না করে শান্তভাবে সালাম দিয়ে সরে আসুন, যাতে অন্যরাও সুযোগ পান।
দোয়া মুখস্থ করার ব্যবহারিক টিপস
- রওনার অন্তত দুই মাস আগে থেকে প্রতিদিন ফজর বা ইশার পর দশ মিনিট অনুশীলন করুন
- আরবি পড়তে অসুবিধা হলে বাংলা উচ্চারণ দেখে পড়ুন; অর্থটা মনে রাখাই আসল
- একসাথে সব নয়, প্রতি সপ্তাহে দুই-তিনটি দোয়া শিখুন
- ছোট একটি নোটবই বা ফোনের নোটে দোয়াগুলো লিখে রাখুন
- কোনো দোয়ার শুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে যাচাই করুন
সাধারণ প্রশ্ন
নিজের ভাষায় দোয়া করা যাবে কি?
হ্যাঁ। তাওয়াফ, সাঈ, আরাফা সবখানেই নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়। আল্লাহ সব ভাষা বোঝেন।
সব দোয়া কি মুখস্থ করতেই হবে?
না। তালবিয়া শেখা সবচেয়ে জরুরি। বাকিগুলো দেখে বা শুনে পড়লেও কোনো সমস্যা নেই।
নারীরা কি তালবিয়া পড়বেন?
হ্যাঁ, তবে নিচু স্বরে, যাতে নিজে শুনতে পান কিন্তু অন্যরা না শোনেন।
দোয়ার সময় হাত তুলতে হবে কি?
আরাফা, সাফা-মারওয়া ও ছোট-মধ্যম জামারার পর হাত তুলে দোয়া করার প্রচলন আছে। তাওয়াফের সময় চলতে চলতে হাত না তুলে মনে মনে দোয়া করাই সহজ।
আগামী উমরাহ বা রমজানের সফরের জন্য প্রস্তুতি নিতে চাইলে দেখুন উমরাহ প্যাকেজ। প্রশিক্ষণ ও যে কোনো তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন।
লেখক: নাজমুস শাকেব, ম্যানেজিং পার্টনার, আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (হজ লাইসেন্স HL ৬২৫)। মক্কায় বেড়ে ওঠা, ঢাকা থেকে হজ-উমরাহ যাত্রীদের সেবায় যুক্ত। আমাদের সম্পর্কে
দ্রষ্টব্য: এটি সাধারণ নির্দেশনা। নির্দিষ্ট মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা হজ গাইডের পরামর্শ নিন। দাবিত্যাগ
আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস | HL 625
উমরাহ, রমজান প্যাকেজ এবং ভবিষ্যৎ হজ সম্পর্কিত তথ্যের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
অফিস: 01552-600854
নাজমুস শাকেব: 01714-075291, 01974-075291 | ওবায়দুর রহমান হানিফ: 01670-787633
আল-সাফওয়া (HL ৬২৫) — যোগাযোগ
নাজমুস শাকেব: 01714-075291 | 01974-075291
হানিফ: 01670-787633 | 01919-787633
অফিস: 01552-600854