
আরাফার দিন অর্থাৎ ৯ জিলহজ হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। হাদিসে এসেছে, নবী (সা.) বলেছেন, “হজ হলো আরাফাত।” আরাফার ময়দানে অবস্থান বা উকুফ ছাড়া হজ সম্পূর্ণ হয় না। যারা হজে যান না, তাঁদের জন্যও এই দিনের আলাদা মর্যাদা আছে। এই লেখায় আরাফার দিনের পরিচয়, সময়সূচি, আমল, দোয়া ও ফজিলত সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
আরাফার ময়দান কোথায় এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আরাফাত মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি উন্মুক্ত প্রান্তর। এর মধ্যে রয়েছে জাবালে রহমত নামের ছোট পাহাড় এবং মসজিদে নামিরা। বিদায় হজে নবী (সা.) এই ময়দানেই তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেন।
কুরআনের সূরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে দ্বীন পূর্ণ হওয়ার ঘোষণা এসেছে। বহু আলেমের বর্ণনা অনুযায়ী এটি বিদায় হজের সময় আরাফার দিনে নাযিল হয়। তাই এই দিন ইসলামের ইতিহাসেও বিশেষ স্মরণীয়।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। আরাফার সীমানার ভেতরে থাকতে হয়। সীমানার বাইরে থাকলে উকুফ আদায় হয় না। তাই তাঁবুর অবস্থান নিয়ে নিশ্চিত না হলে নিজের মুয়াল্লিম বা গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন।
আরাফার দিনের সময়সূচি
নিচের সারণিতে সাধারণ ধারাবাহিকতা দেওয়া হলো। বাস্তব সময় ও যাত্রার ব্যবস্থা মুয়াল্লিম ও হজ ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা অনুযায়ী কিছুটা বদলাতে পারে।
| সময় | করণীয় |
|---|---|
| ৮ জিলহজ | মিনায় অবস্থান ও নামাজ আদায় |
| ৯ জিলহজ সকাল | ফজরের পর আরাফার উদ্দেশে রওনা |
| জোহরের সময় | জোহর ও আসর একসঙ্গে, কসর করে আদায় |
| জোহরের পর থেকে সূর্যাস্ত | দোয়া, যিকির, ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াত |
| সূর্যাস্তের পর | মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা |
উকুফের সময় সাধারণভাবে ৯ জিলহজ দুপুরের পর থেকে ১০ জিলহজ ফজরের আগ পর্যন্ত ধরা হয়। তবে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় থাকা হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ওয়াজিব, তাই সূর্যাস্তের আগে ময়দান ছাড়া উচিত নয়। কেউ কোনো কারণে দেরিতে পৌঁছালে বা সমস্যায় পড়লে কী করবেন, তা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য আলেম বা হজ গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন।
আরাফার দিনের আমল
১. দীর্ঘ সময় দোয়া ও যিকির
আরাফার দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে চাওয়া। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, মা-বাবার জন্য, জীবিত ও মৃত মুসলমানদের জন্য এবং সমগ্র উম্মতের জন্য দোয়া করুন। দুনিয়া ও আখিরাত, দুই জায়গার কল্যাণ চান।
২. তওবা ও ইস্তিগফার
অতীত গুনাহের জন্য মন থেকে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে সেগুলো ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প করুন। যাঁদের সঙ্গে ভুল আচরণ হয়েছে বা যাঁদের হক নষ্ট হয়েছে, দেশে ফিরে তা মিটিয়ে ফেলার নিয়ত করুন।
৩. কুরআন তিলাওয়াত ও তাসবিহ
সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, দরুদ শরিফ এবং ইস্তিগফার বেশি করে পড়ুন। সম্ভব হলে অর্থসহ কিছু আয়াত তিলাওয়াত করুন।
৪. অন্যের সঙ্গে সদাচরণ
আরাফায় বিপুল ভিড়ের মধ্যে ধৈর্য ধরা নিজেই এক ইবাদত। ঝগড়া, কটু কথা ও অপ্রয়োজনীয় তর্ক থেকে দূরে থাকুন। সঙ্গীদের সাহায্য করুন, বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ হাজিদের।
৫. হাজি না হলে করণীয়
যাঁরা হজে নেই, তাঁদের জন্য আরাফার দিনে রোজা রাখা সুন্নত। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, এই রোজা আগের ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে বলে আশা করা যায়। তবে আরাফার ময়দানে অবস্থানরত হাজির জন্য এই রোজা রাখা উত্তম নয়, কারণ দীর্ঘ সময় দোয়া ও ইবাদতের জন্য শক্তি দরকার।
আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া
হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনের দোয়া সর্বোত্তম দোয়া এবং নবী (সা.) ও পূর্ববর্তী নবীদের শ্রেষ্ঠ কথা হলো নিচের তাওহিদের বাক্যটি। জামে তিরমিযির বর্ণনায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
এ ছাড়া কুরআনের এই দুটি দোয়াও আরাফায় পড়া যায়:
- সূরা বাকারা, ২:২০১: “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ ওয়াকিনা আযাবান নার।” অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।
- সূরা আরাফ, ৭:২৩: “রব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতারহামনা লানাকূনান্না মিনাল খাসিরিন।” অর্থ: হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। আপনি ক্ষমা না করলে ও দয়া না করলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
আরবিতে মুখস্থ না থাকলে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে চাইতে কোনো বাধা নেই। আন্তরিকতা ও বিনয়ই আসল।
আরাফার ফজিলত
- সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনে আল্লাহ যত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, অন্য কোনো দিনে এত বেশি মানুষকে দেন না।
- এই দিনে দ্বীন পূর্ণ হওয়ার ঘোষণা এসেছে, যা এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
- হাজি নন এমন মুসলমানের জন্য এই দিনের রোজা বিশেষ সওয়াবের কাজ।
- সারা বিশ্বের মুসলমান একই সময়ে একই ময়দানে একই আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, যা সমতা ও ঐক্যের এক অনন্য দৃশ্য।
আরাফায় শারীরিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা
আরাফার ময়দান খোলা জায়গা, তাই রোদ ও গরম বড় চ্যালেঞ্জ। কিছু বাস্তব পরামর্শ:
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং হালকা খাবার খান।
- প্রয়োজনীয় ওষুধ হাতের কাছে রাখুন, নিয়মিত ওষুধ খেলে সময়মতো খান।
- ইহরামের নিয়ম মেনে প্রয়োজনে ছাতা ব্যবহার করুন। ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজগুলো আগে থেকে জেনে নিন।
- দলের সঙ্গে থাকুন এবং তাঁবুর অবস্থান, মুয়াল্লিম নম্বর ও দলনেতার ফোন নম্বর সঙ্গে রাখুন, যাতে হারিয়ে গেলে সাহায্য পাওয়া যায়।
- বয়স্ক বা অসুস্থ সঙ্গীর প্রতি বাড়তি যত্ন নিন।
আরাফার পর মুজদালিফা
সূর্যাস্তের পর আরাফা থেকে মুজদালিফায় যেতে হয়। সেখানে মাগরিব ও এশা এশার সময়ে একসঙ্গে আদায় করা হয় এবং রাত কাটানো হয়। মুজদালিফা থেকে কঙ্কর নেওয়ার প্রচলন আছে, তবে মিনা থেকে নিলেও চলে। কত সংখ্যক কঙ্কর লাগবে, তা আপনার হজের পরিকল্পনা অনুযায়ী গাইড জানিয়ে দেবেন। বিস্তারিত পড়ুন আমাদের মিনা-আরাফাত-মুজদালিফা গাইডে, আর হজের দোয়ার অর্থ জানতে দেখুন হজের দোয়া বাংলা।
সাধারণ প্রশ্ন
আরাফায় না থাকলে কি হজ হবে?
না। আরাফার উকুফ হজের ফরজ। এটি ছুটে গেলে হজ আদায় হয় না। তাই এই দিনের সময় ও সীমানা নিয়ে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আরাফার দিনে কি জোহর-আসর একসঙ্গে পড়তে হয়?
হ্যাঁ, নবী (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী আরাফায় জোহর ও আসর জোহরের সময়ে একসঙ্গে ও কসর করে পড়া হয়। হানাফি মাযহাবে জামাতের শর্ত ও অন্যান্য বিষয়ে কিছু বিশদ নিয়ম আছে, তাই আলেম বা গাইডের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
আরাফার দিনে দোয়ার নির্দিষ্ট ভাষা আছে কি?
না। মাসনুন দোয়া পড়া উত্তম, তবে নিজের ভাষায় মনের কথা বলা যায়।
আরাফার তাঁবু কি সীমানার বাইরে পড়তে পারে?
সাধারণত ব্যবস্থাপনা আরাফার সীমানার ভেতরেই থাকে, তবুও নিশ্চিত হতে মুয়াল্লিম বা গাইডকে জিজ্ঞাসা করুন।
দ্রষ্টব্য: এটি সাধারণ নির্দেশনা। নির্দিষ্ট মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা অভিজ্ঞ হজ গাইডের পরামর্শ নিন।
সম্পর্কিত: সাম্প্রতিক উমরাহ ও রমজানের প্যাকেজ দেখতে উমরাহ প্যাকেজ ও রমজান প্যাকেজ পাতা ঘুরে আসুন।
উমরাহ ও ভবিষ্যৎ হজের তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন
Al-Safwa Trade Tours & Travels (HL ৬২৫) · Dhaka Trade Tours & Travels (HL ৩৩৬)
01552-600854 · নাজমুস শাকেব 01714-075291, 01974-075291 · ওবায়দুর রহমান হানিফ 01670-787633
যোগাযোগ করুন উমরাহ প্যাকেজআল-সাফওয়া (HL ৬২৫) — যোগাযোগ
নাজমুস শাকেব: 01714-075291 | 01974-075291
হানিফ: 01670-787633 | 01919-787633
অফিস: 01552-600854