
ইহরাম বাঁধার পর কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। হজ ও উমরাহর সফরে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আগে থেকে জানা থাকলে অনিচ্ছাকৃত ভুল অনেক কমে যায়। নিচে সহজ ভাষায় ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলো দেওয়া হলো।
সব হাজির জন্য নিষিদ্ধ কাজ
- নখ, চুল বা শরীরের লোম কাটা বা উপড়ে ফেলা।
- সুগন্ধি ব্যবহার করা, ইহরামের পর সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা তেল ব্যবহার করাও এর মধ্যে পড়ে।
- স্থলের পশু শিকার করা বা শিকারে সহায়তা করা।
- মক্কার হারামের গাছ কাটা বা ঘাস উপড়ে ফেলা।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক ও তার আনুষঙ্গিক আচরণ।
- ঝগড়া, গালিগালাজ ও গুনাহের কাজ।
- বিয়ের প্রস্তাব, বিয়ের আকদ বা বিয়ে পড়ানো।
পুরুষদের জন্য বিশেষ নিষেধাজ্ঞা
- সেলাইযুক্ত কাপড় (জামা, পায়জামা, গেঞ্জি, মোজা ইত্যাদি) পরা।
- মাথা ঢাকা বা টুপি, পাগড়ি পরা।
মহিলাদের জন্য বিশেষ নিষেধাজ্ঞা
- মুখে লেগে থাকে এমন নিকাব বা পর্দা ব্যবহার করা।
- হাতমোজা পরা।
তবে বেগানা পুরুষের সামনে ওড়না বা পর্দা এমনভাবে ব্যবহার করা যায় যাতে মুখে না লাগে। এ বিষয়ে আলেমের নির্দেশনা নিন।
যেসব কাজ ইহরামে অনুমতি আছে
- গোসল করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা।
- ইহরামের কাপড় বদলানো বা ধোয়া।
- ছাতা ব্যবহার করা (পুরুষদের জন্যও)।
- আংটি, ঘড়ি বা বেল্ট ব্যবহার করা।
ভুল হয়ে গেলে কী করবেন?
নিষিদ্ধ কাজের ধরন ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে জরিমানা (দম, সদকা বা ফিদইয়া) ভিন্ন হয়। ভুল হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে গ্রুপ গাইড বা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে বিস্তারিত বলে সমাধান জেনে নিন।
প্রশ্নোত্তর
ইহরামে ঘুমের মধ্যে মাথা ঢেকে গেলে কী হবে?
জেনে-বুঝে না হলে সাধারণত তৎক্ষণাৎ সরিয়ে নিলে সমস্যা হয় না। দীর্ঘ সময় ঢাকা থাকলে আলেমের পরামর্শ নিন।
ইহরামে ওষুধ বা মলম ব্যবহার করা যায়?
সুগন্ধিমুক্ত ওষুধ ও মলম সাধারণত ব্যবহার করা যায়। সন্দেহ থাকলে ডাক্তার ও আলেমের সঙ্গে আলোচনা করুন।
ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি না থাকা হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ, সুগন্ধিমুক্ত সাবান ও হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করা যায়।
ইহরাম অবস্থায় প্রচলিত ভুল ধারণা
- ইহরাম মানে শুধু সাদা কাপড় পরা: আসলে ইহরাম হলো নিয়ত ও তালবিয়াহ দিয়ে ইবাদতে প্রবেশ। কাপড় পরাটা তার অংশ মাত্র।
- ছাতা ব্যবহার একেবারে নিষেধ: বহু আলেমের মতে ছাতা বা ছায়ার ব্যবস্থা ব্যবহার করা বৈধ। তবে নিয়ম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
- সব ধরনের হ্যান্ডওয়াশ নিষেধ: সুগন্ধিমুক্ত সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার সাধারণত অনুমোদিত।
পুরুষদের জুতা ও পোশাক সংক্রান্ত নির্দেশনা
পুরুষদের জন্য এমন জুতা পরা নিষিদ্ধ, যা পায়ের গোড়ালির উঁচু হাড় ঢেকে রাখে। এজন্য খোলা স্যান্ডেল বা চপ্পল সাধারণত ব্যবহার করা হয়। ইহরামের বেল্ট বা ক্লিপ ব্যবহার সম্পর্কে ফকিহদের মধ্যে বিভিন্ন মত আছে; বহু আলেম টাকা-পয়সা ও কাগজপত্র রাখার ইহরাম বেল্টকে অনুমোদন দিয়েছেন। নিশ্চিত না হলে গ্রুপের আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন।
মহিলাদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
- ইহরামের জন্য নির্দিষ্ট রঙ বা বিশেষ পোশাক নেই; শালীন, ঢিলেঢালা পোশাকই যথেষ্ট।
- মুখে লেগে থাকে এমন নিকাব বা হাতমোজা পরা যাবে না। পরপুরুষের সামনে ওড়না বা পর্দা এমনভাবে ব্যবহার করা যায় যাতে মুখে না লাগে।
- মোজা ও জুতা ব্যবহারে বাধা নেই।
ভিড় ও বিমানযাত্রায় সতর্কতা
বিমানে বা বাসে ভিড়ের মধ্যে ঝগড়া ও কথা-কাটাকাটি থেকে বিরত থাকাও ইহরামের আদবের অংশ। দীর্ঘ যাত্রায় ঘুমের সময় অজান্তে মাথা ঢেকে গেলে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিন। যাত্রার আগে নিজের গ্রুপ লিডারের কাছ থেকে ফ্লাইটে ইহরামের নিয়ত কখন করতে হবে তা জেনে নেওয়া উচিত।
ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার পর
দম, সদকা ও ফিদইয়া — পার্থক্য কী
ইহরামে ভুল হলে সবার আগে মানুষ জানতে চান, “এখন কী দিতে হবে?” জরিমানা তিন ধরনের হতে পারে, আর কোনটা প্রযোজ্য তা নির্ভর করে কাজটি কী ছিল, কতটুকু হয়েছে, আর ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত ছিল তার ওপর।
- দম — একটি পশু (সাধারণত ছাগল/দুম্বা) হারামের সীমানায় জবাই করা। তুলনামূলক বড় লঙ্ঘনে প্রযোজ্য, যেমন মিকাত থেকে ইহরাম না বেঁধে অতিক্রম করা।
- সদকা — সাধারণত একজন মিসকিনকে খাওয়ানো বা সমপরিমাণ অর্থ দান। ছোট মাত্রার লঙ্ঘনে, যেমন অল্প পরিমাণ সুগন্ধি লাগা বা সামান্য লোম পড়ে যাওয়া।
- ফিদইয়া — ওজর বা অসুবিধার কারণে জেনেশুনে নিষিদ্ধ কাজ করতে বাধ্য হলে (যেমন অসুস্থতার কারণে মাথা কামানো) নির্ধারিত বিকল্প: রোজা, দান বা কুরবানি।
খুঁটিনাটিতে মাযহাবভেদে পার্থক্য আছে এবং পরিমাণ পরিস্থিতিভেদে বদলায়। তাই নিজে হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেবেন না — যা ঘটেছে হুবহু বলে নির্ভরযোগ্য আলেম বা গ্রুপ গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন। অনেক সময় দেখা যায়, যা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল তাতে আসলে কিছুই ওয়াজিব হয়নি।
সুগন্ধিমুক্ত জিনিস চিনবেন কীভাবে
ইহরামে সবচেয়ে বেশি অনিচ্ছাকৃত ভুল হয় সুগন্ধি নিয়ে — কারণ সাবান, টুথপেস্ট, টিস্যু, লোশন, এমনকি বিমানের দেওয়া ওয়েট টিস্যুতেও সুগন্ধি থাকে।
- সফরের আগেই unscented বা fragrance-free লেখা সাবান, শ্যাম্পু ও টুথপেস্ট কিনে রাখুন। ইহরামের ব্যাগে আলাদা করে রাখুন।
- প্যাকেটের উপাদান তালিকায় “parfum”, “fragrance” বা “perfume” থাকলে সেটি ইহরামে ব্যবহার করবেন না।
- ইহরামের কাপড়ে আগে থেকে সুগন্ধি লাগিয়ে রাখবেন না। তবে ইহরাম বাঁধার আগে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েজ, এবং তার ঘ্রাণ পরে থেকে গেলে অসুবিধা নেই।
- হোটেলের সরবরাহ করা সাবান-শ্যাম্পু সাধারণত সুগন্ধিযুক্ত — নিজেরটা ব্যবহার করুন।
নারীদের হায়েজ ও ইহরাম
হায়েজ অবস্থায়ও মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হয় এবং নিয়ত করতে হয় — এটি বাদ দেওয়া যায় না। ইহরামের নিষেধাজ্ঞাগুলোও সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাওয়াফ করা যায় না; সেই সময়টা অপেক্ষা করতে হয়। সফরের তারিখ ও সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আগেই গ্রুপ লিডার ও আলেমের সঙ্গে কথা বলে রাখলে সফরে গিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক কমে।
হোটেল ও দৈনন্দিন জীবনে যা খেয়াল রাখবেন
- তোয়ালে: গোসলের পর তোয়ালে ব্যবহার করা যায়; এটি সেলাই করা পোশাক পরার মধ্যে পড়ে না। তবে পুরুষেরা তা গিঁট দিয়ে বা পিন দিয়ে শরীরে আটকে রাখবেন না।
- কম্বল ও চাদর: ঘুমানোর সময় শরীর ঢেকে রাখা যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুধু মাথা ঢাকা নিয়ে সতর্কতা।
- মাস্ক: প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার নিয়ে ফকিহদের মত ভিন্ন; মহিলাদের ক্ষেত্রে মুখে লেগে থাকার বিষয়টি বিবেচ্য। নিজের মাযহাবের নির্দেশনা জেনে নিন।
- নখ ভেঙে গেলে: নিজে থেকে বাকিটা কেটে ফেলবেন না; আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।
- চুল পড়া: অজু বা গোসলের সময় স্বাভাবিকভাবে কয়েকটি চুল পড়ে গেলে সাধারণত কিছু ওয়াজিব হয় না।
দুশ্চিন্তা নয়, প্রস্তুতি
ইহরামের নিষেধাজ্ঞার তালিকা দেখে অনেকে ভয় পেয়ে যান। বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষের সফর কোনো জরিমানা ছাড়াই শেষ হয়। যে দুটি জিনিস আগে থেকে ঠিক করে রাখলে প্রায় সব ভুল এড়ানো যায়, তা হলো — মিকাতের আগে নিয়ত করা এবং সুগন্ধিমুক্ত প্রসাধনী সঙ্গে রাখা। বাকিটা স্বাভাবিক সতর্কতায় চলে যায়। ভুল হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে সঙ্গে থাকা আলেমকে জানান; ইসলামে এই ভুলগুলোর সমাধান দেওয়াই আছে।
উমরাহতে হলক বা কসরের পর এবং হজে নির্ধারিত আমল সম্পন্ন করার পর ইহরামের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। এর আগে ইহরামমুক্ত হওয়ার ঘোষণা বা অনুমতি না নিয়ে কোনো নিষিদ্ধ কাজ করবেন না।