
প্রথমবার উমরাহ করতে যাচ্ছেন? উমরাহ করার নিয়ম আসলে পাঁচটি ধাপে বিভক্ত: ইহরাম ও নিয়ত, তাওয়াফ, তাওয়াফের পরের নামাজ, সাঈ এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা। এই লেখায় ধাপগুলো সহজ বাংলায় ক্রমানুসারে দেওয়া হলো, যাতে সফরের আগেই পুরো চিত্রটা আপনার কাছে পরিষ্কার থাকে।
উমরাহ কী এবং কখন করা যায়?
উমরাহ হলো মক্কায় গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত পালন করা। হজের মতো এর নির্দিষ্ট সময় নেই; বছরের প্রায় যেকোনো সময় উমরাহ করা যায়। হজের সময়সীমা ও ফরজ-ওয়াজিবের বিধান আলাদা, তাই উমরাহ ও হজের পার্থক্য আগে জেনে নেওয়া ভালো।
ধাপ ১: ইহরাম ও নিয়ত
- পুরুষেরা সেলাইবিহীন দুই টুকরা সাদা কাপড় পরেন; মহিলারা সাধারণ শালীন পোশাকেই ইহরাম বাঁধেন।
- গোসল বা অজু করে ইহরামের কাপড় পরার পর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব।
- মিকাত অতিক্রমের আগে উমরাহর নিয়ত করে তালবিয়াহ পড়া শুরু করতে হয়: “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”।
- ঢাকা থেকে সরাসরি জেদ্দাগামী ফ্লাইটে সাধারণত বিমান মিকাত বরাবর পৌঁছানোর আগে ইহরামের নিয়ত করতে হয়। বিমানের ঘোষণা ও গ্রুপ লিডারের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। যারা আগে মদিনায় যান, তাঁরা সাধারণত মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে যুলহুলাইফা (আবইয়ারে আলী) থেকে ইহরাম বাঁধেন।
ধাপ ২: তাওয়াফ
কাবা শরিফকে বাঁ দিকে রেখে হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে সাত চক্কর ঘুরতে হয়। পুরুষদের জন্য প্রথম তিন চক্করে রমল (দ্রুত ছোট পদক্ষেপে চলা) এবং ইযতিবা (ডান কাঁধ খোলা রাখা) সুন্নত। প্রতিটি চক্কর হাজরে আসওয়াদ বরাবর এসে শেষ হয়। ভিড়ের সময় ধাক্কাধাক্কি না করে দূর থেকে ইশারা করাই যথেষ্ট। তাওয়াফের বিস্তারিত নিয়ম আলাদা গাইডে দেওয়া আছে।
ধাপ ৩: মাকামে ইবরাহীমের কাছে দুই রাকাত নামাজ
তাওয়াফ শেষে সম্ভব হলে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে, ভিড় থাকলে মসজিদুল হারামের যেকোনো স্থানে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এরপর যমযমের পানি পান করা সুন্নত।
ধাপ ৪: সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ
সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে মারওয়ায় গেলে এক চক্কর ধরা হয়। এভাবে সাত চক্কর হবে এবং শেষ হবে মারওয়ায়। সবুজ বাতি দেওয়া অংশে পুরুষেরা দ্রুত হাঁটেন। সাঈ চলাকালীন দোয়া ও জিকির করা উত্তম।
ধাপ ৫: হলক বা কসর
সাঈ শেষে পুরুষেরা মাথা মুণ্ডন (হলক) করেন অথবা চুল ছোট করেন (কসর)। মহিলারা চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙুলের এক গিরা পরিমাণ কেটে নেন। এর মাধ্যমে ইহরাম থেকে মুক্ত হয়ে উমরাহ সম্পন্ন হয়।
সফরের আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
- উমরাহর নিয়ম ও দোয়া একবার অনুশীলন করে নিন।
- ইহরামের কাপড়, আরামদায়ক জুতা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন।
- গ্রুপ লিডারের মোবাইল নম্বর ও হোটেলের ঠিকানা সঙ্গে রাখুন।
- উমরাহ সফরের সম্ভাব্য খরচ ও ভিসার প্রক্রিয়া আগে জেনে নিন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
উমরাহ করতে কত সময় লাগে?
ভিড় ও শারীরিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে, তবে ইহরাম থেকে হলক পর্যন্ত মূল আমল সাধারণত কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়।
একই সফরে একাধিক উমরাহ করা যায় কি?
হ্যাঁ, সফরের সময় কয়েকবার উমরাহ করা যায়, তবে প্রতিবারই নতুন করে ইহরাম বাঁধতে হয়। নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
মাযহাব অনুযায়ী কি কিছু পার্থক্য আছে?
হ্যাঁ, খুঁটিনাটি বিধানে মাযহাবভেদে পার্থক্য আছে। তাই আপনার অনুসৃত মাযহাবের নির্ভরযোগ্য আলেম বা গ্রুপ গাইডের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
উমরাহর ফরজ ও ওয়াজিব — এক নজরে
ফকিহদের ভাষ্য অনুযায়ী উমরাহর মূল রুকন হলো ইহরাম ও তাওয়াফ। সাঈ এবং হলক বা কসর ওয়াজিব হিসেবে গণ্য করা হয় (মাযহাবভেদে শ্রেণিবিন্যাসে পার্থক্য আছে)। এর অর্থ, এগুলোর কোনোটি বাদ গেলে উমরাহ অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। তাই ধাপগুলো ক্রম অনুযায়ী পালন করা জরুরি।
উমরাহর দিনের সময়সূচি কেমন হতে পারে
- মক্কায় পৌঁছানোর পর: হোটেলে লাগেজ রেখে অল্প বিশ্রাম নিয়ে উমরাহর আমল শুরু করা যায়। দীর্ঘ ভ্রমণের পর ক্লান্তি বেশি থাকলে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেওয়াই ভালো।
- তাওয়াফের সময়: ফজরের পর বা গভীর রাতে ভিড় তুলনামূলক কম থাকে। দুপুরের গরমে বাইরের চত্বরে তাওয়াফ কষ্টকর হতে পারে।
- সাঈর সময়: সাঈ সাধারণত তাওয়াফের পরই করা হয়। দুই আমলের মাঝে সামান্য বিশ্রাম ও পানি পান করা যায়, তবে বেশি দেরি না করাই উত্তম।
- হলকের জন্য: মারওয়ার কাছাকাছি নির্ধারিত সেলুনে বা হোটেলে সুবিধাজনকভাবে হলক বা কসর করা যায়। ভিড়ের কারণে অপেক্ষার জন্য সময় রাখুন।
প্রথমবারের উমরাহকারীদের সাধারণ ভুল
- মিকাত পার হওয়ার আগে ইহরামের নিয়ত না করা — এতে অতিরিক্ত বিধান বা কাফফারা আসতে পারে।
- তাওয়াফের চক্কর গণনায় ভুল করা। সন্দেহ হলে নিশ্চিত সংখ্যাটি ধরে নেওয়া সতর্ক পদ্ধতি।
- ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের চেষ্টা। এটি সুন্নত, কিন্তু অন্যকে কষ্ট দিয়ে করা উচিত নয়।
- সাঈ শুরু করার আগে অজু ভেঙে গেলে কী করণীয় তা আগে জেনে না নেওয়া।
- চুল কাটার আগে ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলা, যেমন নখ বা চুল কাটা।
শারীরিক প্রস্তুতির কিছু পরামর্শ
মহিলাদের উমরাহ — যে বিষয়গুলো আলাদা
মহিলাদের জন্য ইহরামের আলাদা কোনো পোশাক নেই; শালীন ও ঢিলেঢালা স্বাভাবিক পোশাকেই ইহরাম হয়ে যায়। মাথা ঢাকা থাকবে, তবে মুখে লেগে থাকে এমন নিকাব বা হাতমোজা ইহরাম অবস্থায় পরা যায় না। পরপুরুষের সামনে পর্দার প্রয়োজন হলে ওড়না বা কাপড় এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা যায় যাতে তা মুখে স্পর্শ না করে — এ বিষয়ে নিজের মাযহাবের নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা নিয়ে নিন।
তালবিয়াহ মহিলারা নিচু স্বরে পড়েন। তাওয়াফে রমল ও ইযতিবা, এবং সাঈতে সবুজ বাতির মাঝে দ্রুত হাঁটা — এগুলো শুধু পুরুষদের জন্য, মহিলাদের জন্য নয়।
হায়েজ অবস্থায় কী করবেন
এটি সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর একটি, আর অনেকেই এর উত্তর না জেনে সফরে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। সংক্ষেপে:
- ইহরাম বাঁধা যায়। হায়েজ অবস্থাতেও মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে ও নিয়ত করতে হবে — এটি বাদ দেওয়া যাবে না।
- তাওয়াফ করা যাবে না। পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাওয়াফ ছাড়া উমরাহ সম্পন্ন হয় না।
- ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে এবং ইহরামের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে, যতক্ষণ না পবিত্র হয়ে তাওয়াফ-সাঈ করে হলক/কসর সম্পন্ন হয়।
- সফরের দৈর্ঘ্য কম হলে বা ফ্লাইটের তারিখ কাছাকাছি থাকলে সমস্যা জটিল হতে পারে। তাই সফরের আগেই গ্রুপ লিডার ও নির্ভরযোগ্য আলেমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে রাখুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে সময় পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না।
বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য
হারাম শরিফে হুইলচেয়ার ও ইলেকট্রিক কার্টের ব্যবস্থা আছে, এবং উপরের তলাগুলোতেও তাওয়াফ ও সাঈ করা যায়। উপরের তলায় এক চক্করের দূরত্ব নিচতলার চেয়ে বেশি, তাই সময় বেশি লাগে — এটা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন।
- নিজে হাঁটতে না পারলে অন্যের ঠেলে দেওয়া হুইলচেয়ারে তাওয়াফ ও সাঈ করা যায়।
- নিয়মিত ওষুধ হাতব্যাগে রাখুন, লাগেজে নয়। প্রেসক্রিপশনের একটি কপি সঙ্গে রাখুন।
- ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ থাকলে গ্রুপ লিডারকে আগেই জানিয়ে রাখুন, যাতে জরুরি অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
- ভিড়ের সময় এড়িয়ে ফজরের পর বা গভীর রাতে আমল করলে ধকল অনেক কম হয়।
খরচ ও সময়ের বাস্তব হিসাব
উমরাহর মূল আমল কয়েক ঘণ্টার, কিন্তু সফরের দৈর্ঘ্য নির্ভর করে প্যাকেজের ওপর। বাংলাদেশ থেকে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ রাতের প্যাকেজ বেশি প্রচলিত; রমজানে ২০ থেকে ৩১ রাতের দীর্ঘ প্যাকেজও হয়। হোটেল হারাম থেকে কত দূরে, খাবার ও জিয়ারত প্যাকেজে আছে কি না, আর রুমে কতজন থাকছেন — মূলত এই তিনটি বিষয়ই দামের পার্থক্য তৈরি করে। বুকিংয়ের আগে এই তিনটি লিখিতভাবে জেনে নেওয়া সবচেয়ে জরুরি।
উমরাহ অনেক হাঁটার আমল। তাওয়াফ ও সাঈ মিলিয়ে সাধারণত কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয়। সফরের আগে থেকে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করা, আরামদায়ক জুতা সঙ্গে রাখা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা উপকারী। বয়স্ক বা অসুস্থ হাজিদের জন্য হুইলচেয়ার ও ব্যবস্থার তথ্য আগে থেকে গ্রুপ লিডারের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।