
তাওয়াফ মানে কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ করা। হজ ও উমরাহ — দুটি ইবাদতেরই অপরিহার্য অংশ এটি। প্রথমবার মসজিদুল হারামে গিয়ে বিশাল ভিড়, চারপাশের ধাক্কা আর আবেগের মধ্যে অনেকেই নিয়ম গুলিয়ে ফেলেন। আগে থেকে ধাপগুলো পরিষ্কার জানা থাকলে ভিড়ের মধ্যেও শান্তভাবে মনোযোগ দিয়ে তাওয়াফ করা যায়। এই লেখায় প্রস্তুতি, ধাপে ধাপে নিয়ম, তাওয়াফের প্রকার, সাধারণ ভুল ও বাস্তব পরামর্শ সহজ ভাষায় দেওয়া হলো।
তাওয়াফের আগে প্রস্তুতি
- ওযু অবস্থায় থাকুন এবং পোশাক পবিত্র রাখুন। হানাফি মাযহাবে তাওয়াফের জন্য ওযু ওয়াজিব; ওযু ভেঙে গেলে বের হয়ে ওযু করে ফিরে এসে আবার শুরু করা ভালো।
- হজ বা উমরাহর তাওয়াফে ইহরামের নিয়ম মেনে চলুন এবং শরীর ঢাকা রাখুন।
- পরিবার বা দলের সদস্যদের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থান ঠিক করে নিন, কারণ ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা।
- জুতা একটি ছোট ব্যাগে ভরে সঙ্গে রাখুন অথবা নির্ধারিত স্থানে রাখুন এবং জায়গাটি মনে রাখুন।
- তাওয়াফের আগে সামান্য পানি পান করে নিন; গরমে ক্লান্তি দ্রুত আসে।
ধাপে ধাপে তাওয়াফের নিয়ম
- নিয়ত: মনে মনে নির্দিষ্ট তাওয়াফের নিয়ত করুন। উমরাহর তাওয়াফ, হজের তাওয়াফ বা নফল তাওয়াফ — কোনটি করছেন তা ঠিক রাখুন।
- শুরুর স্থান: হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরের সোজাসুজি দাঁড়ান। এখানে সবুজ বাতি বা চিহ্ন থাকে, যা শুরুর সীমা বোঝায়।
- ইস্তিলাম: ভিড়ের কারণে চুমু দেওয়া সম্ভব না হলে ডান হাত তুলে হাতের তালু হাজরে আসওয়াদের দিকে ফিরিয়ে ইশারা করুন এবং “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলুন। ধাক্কাধাক্কি করে কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
- দিক: কাবা আপনার বাঁ দিকে থাকবে। অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরতে হবে।
- সাত চক্কর: হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে আবার সেখানে ফিরে এলে এক চক্কর পূর্ণ হয়। এভাবে সাত চক্কর শেষ করতে হবে।
- হাতিমের বাইরে দিয়ে: হিজরে ইসমাঈল বা হাতিমের ভেতর দিয়ে হাঁটলে সেই চক্কর গণ্য হয় না। হাতিম কাবার একদিকে অর্ধবৃত্তাকার দেয়ালঘেরা অংশ; এর বাইরের দিক দিয়ে ঘুরতে হবে।
- রুকনে ইয়ামানি: কাবার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ। সম্ভব হলে হাত দিয়ে স্পর্শ করুন, না হলে ইশারা করার প্রয়োজন নেই। রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে সূরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতের দোয়া পড়ার প্রচলন আছে।
- দুই রাকাত নামাজ: সাত চক্করের পর মাকামে ইবরাহীমের কাছাকাছি, ভিড়ে সম্ভব না হলে হারাম শরিফের যেকোনো স্থানে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ পড়ুন। নিষিদ্ধ সময়ে (সূর্যোদয়, ঠিক দুপুর ও সূর্যাস্তের সময়) নামাজ পরে পড়ুন।
- যমযম ও দোয়া: নামাজের পর যমযমের পানি পান করে দোয়া করুন। উমরাহ বা সাঈযুক্ত তাওয়াফ হলে এরপর সাফা-মারওয়ার সাঈ।
রামল ও ইদ্তিবা
যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে — যেমন উমরাহর তাওয়াফ — সেখানে পুরুষরা প্রথম তিন চক্করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে দ্রুত ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটেন, একে রামল বলা হয়। ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে এনে ডান কাঁধ খোলা রাখাকে ইদ্তিবা বলে। ভিড়ের কারণে রামল সম্ভব না হলে কাউকে কষ্ট দেবেন না; স্বাভাবিকভাবে হাঁটুন। নারীরা রামল ও ইদ্তিবা করেন না। নামাজের সময় কাঁধ ঢেকে নেবেন।
তাওয়াফের প্রকার
| তাওয়াফ | কখন | হুকুম |
|---|---|---|
| কুদুম বা আগমনী | মক্কায় পৌঁছে হজের আগে, বিশেষত ইফরাদ ও কিরান হজকারীর জন্য | সুন্নত |
| উমরাহর তাওয়াফ | উমরাহর ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশের পর | ফরজ |
| যিয়ারাহ বা ইফাদা | ১০ জিলহজের পর | হজের ফরজ |
| বিদায়ি বা ওয়াদা | মক্কা ছাড়ার আগে | বাইরে থেকে আগতদের জন্য ওয়াজিব |
| নফল | যেকোনো সময় | সওয়াবের কাজ |
সাধারণ ভুল যা এড়ানো উচিত
- চক্করের সংখ্যা ভুল করা। সন্দেহ হলে সাধারণত কম সংখ্যা ধরে এগোনোর কথা বলা হয়; তবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আলেমের পরামর্শ নিন।
- হাজরে আসওয়াদে চুমু দিতে গিয়ে অন্যদের ধাক্কা দেওয়া। ভিড়ে দূর থেকে ইশারা যথেষ্ট।
- হাতিমের ভেতর দিয়ে হাঁটা বা কাবার দিকে পিঠ দিয়ে ঘোরা।
- তাওয়াফের পথে বসে বা দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া, যা অন্যদের চলাচলে বাধা দেয়।
- ছবি বা ভিডিও করতে গিয়ে মনোযোগ নষ্ট করা এবং সামনের মানুষকে আটকে রাখা।
- দলছুট হয়ে যাওয়ার ভয়ে দ্রুত ও অগোছালোভাবে হাঁটা।
ফরজ নামাজের জামাত শুরু হলে
তাওয়াফ চলাকালে ফরজ নামাজের ইকামত হলে তাওয়াফ থামিয়ে কাতারে শামিল হতে হয়। নামাজ শেষে যে স্থান থেকে থেমেছিলেন সেখান থেকে বাকি চক্কর শুরু করা যায়। একইভাবে বিরতি নিতে হলে বা ওযু নবায়নের প্রয়োজন হলে দলের সঙ্গে সমন্বয় করে নিন।
ভিড়ের সময় বাস্তব পরামর্শ
- মাতাফের নিচতলায় ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রয়োজনে উপরের তলায় বা ছাদে তাওয়াফ করা যায়; সেখানে ঘুরতে সময় বেশি লাগে, তবে ভিড় তুলনামূলক কম।
- বয়স্ক বা শারীরিকভাবে দুর্বল হলে হুইলচেয়ার বা ট্রলি সহায়তা নেওয়ার সুযোগ আছে; কীভাবে নেবেন তা দলনেতার কাছে আগে জেনে নিন।
- পরিবারের সদস্যরা একে অপরের হাত বা চাদর ধরে সারিবদ্ধভাবে হাঁটুন, তবে অন্যদের পথ আটকাবেন না।
- শিশুদের সঙ্গে থাকলে তাদের পরিচয়পত্র বা দলের ফোন নম্বর লিখে পকেটে দিন।
- রাশ আওয়ারে না গিয়ে তুলনামূলক কম ভিড়ের সময়ে নফল তাওয়াফ করার চেষ্টা করুন।
- চক্কর গোনার জন্য আঙুলের কাউন্টার বা ছোট মালা ব্যবহার করা যায়।
নারী ও হায়েজের বিধান
হায়েজ বা নিফাস অবস্থায় তাওয়াফ করা যায় না; পবিত্র হওয়ার পর করতে হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম জানতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন এবং দলনেতাকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখুন। বিস্তারিত পড়ুন মহিলাদের হজ ও উমরাহ গাইড।
সাধারণ প্রশ্ন
তাওয়াফের সময় কি নির্দিষ্ট দোয়া পড়তেই হবে?
না। প্রতি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, দরুদ ও নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়।
তাওয়াফে কথা বলা যায় কি?
প্রয়োজনীয় কথা বলা যায়, তবে অযথা কথা ও আড্ডা এড়িয়ে চলা উচিত। এ সময় যিকির ও দোয়ায় মন দেওয়া ভালো।
সাত চক্কর শেষে কি আবার হাজরে আসওয়াদে ইশারা করতে হয়?
হ্যাঁ, সপ্তম চক্কর শেষ হলে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে তাওয়াফ সমাপ্ত করা সুন্নত।
ক্লান্ত হলে কি তাওয়াফের মাঝে বসে বিশ্রাম নেওয়া যায়?
প্রয়োজনে অল্প বিরতি নেওয়া যায়। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ বিরতি দিলে তাওয়াফের ধারাবাহিকতা নিয়ে আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আল-সাফওয়ার সঙ্গে প্রস্তুতি
উমরাহ বা রমজানের সফরের আগে তাওয়াফ, সাঈ ও ইহরামের নিয়ম হাতে-কলমে শেখা খুব কাজে আসে। বর্তমান উমরাহ প্যাকেজ ও রমজান প্যাকেজের তথ্য দেখুন অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন।
সম্পর্কিত পড়ুন
লেখক: নাজমুস শাকেব, ম্যানেজিং পার্টনার, আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (হজ লাইসেন্স HL ৬২৫)। মক্কায় বেড়ে ওঠা, ঢাকা থেকে হজ-উমরাহ যাত্রীদের সেবায় যুক্ত। আমাদের সম্পর্কে
দ্রষ্টব্য: এটি সাধারণ নির্দেশনা। নির্দিষ্ট মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা হজ গাইডের পরামর্শ নিন। দাবিত্যাগ
আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস | HL 625
উমরাহ, রমজান প্যাকেজ এবং ভবিষ্যৎ হজ সম্পর্কিত তথ্যের জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
অফিস: 01552-600854
নাজমুস শাকেব: 01714-075291, 01974-075291 | ওবায়দুর রহমান হানিফ: 01670-787633
যোগাযোগ করুনআল-সাফওয়া (HL ৬২৫) — যোগাযোগ
নাজমুস শাকেব: 01714-075291 | 01974-075291
হানিফ: 01670-787633 | 01919-787633
অফিস: 01552-600854