
ইহরাম ছাড়া হজ বা উমরাহ শুরুই হয় না। অনেক হাজি ও উমরাহযাত্রী প্রথমবার ইহরাম পরার নিয়ম, মীকাত ও নিষিদ্ধ কাজ নিয়ে দ্বিধায় পড়েন। এই লেখায় ইহরাম পরার নিয়ম ধাপে ধাপে সহজ ভাষায় দেওয়া হলো, যাতে যাত্রার আগেই আপনি প্রস্তুত থাকতে পারেন।
ইহরাম কী ও ইহরাম পরার নিয়মের মূল কথা
ইহরাম হলো হজ বা উমরাহর নিয়ত করে নির্দিষ্ট কিছু কাজ নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেওয়া এবং তালবিয়া পাঠ শুরু করা। ইহরামের জন্য নির্ধারিত পোশাক পরা সুন্নত, তবে আসল বিষয় হলো নিয়ত ও তালবিয়া। ইহরাম বাঁধার পর থেকে হালাল হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকতে হয়।
মিকাত: কোথা থেকে ইহরাম বাঁধবেন?
মিকাত হলো সেই নির্ধারিত সীমা, যা ইহরাম ছাড়া পার হওয়া যায় না। প্রধান মিকাতগুলো:
| মিকাত | যাদের জন্য |
|---|---|
| যুল-হুলাইফা (আবইয়ারে আলী) | মদিনার দিক থেকে মক্কায় আসা যাত্রী |
| ইয়ালামলাম | ইয়েমেন ও এই দিক দিয়ে আসা যাত্রী। ঢাকা থেকে সরাসরি জেদ্দাগামী ফ্লাইট সাধারণত এই মিকাতের ওপর দিয়ে যায় |
| আল-জুহফা | সিরিয়া, মিসর, মরক্কোর দিক থেকে আসা যাত্রী |
| কারনুল মানাযিল | নজদের দিক থেকে আসা যাত্রী |
| যাতু ইরক | ইরাকের দিক থেকে আসা যাত্রী |
বিমানে গেলে সাধারণত ঢাকা বিমানবন্দর বা ফ্লাইটে ওঠার আগেই ইহরামের কাপড় পরে প্রস্তুত থাকা হয় এবং ফ্লাইটে মিকাত আসার আগে ক্রুদের ঘোষণা অনুযায়ী নিয়ত ও তালবিয়া শুরু করা হয়। বিস্তারিত নির্দেশনা আপনার হজ গাইড বা এজেন্সির কাছ থেকে যাত্রার আগে নিশ্চিত করে নিন। মদিনা হয়ে মক্কায় গেলে মদিনা থেকে বের হওয়ার সময় যুল-হুলাইফায় ইহরাম বাঁধা হয়।
ইহরামের পোশাক
| বিষয় | পুরুষ | নারী |
|---|---|---|
| পোশাক | সেলাইবিহীন দুটি সাদা চাদর (একটি লুঙ্গির মতো, একটি গায়ে) | সাধারণ শালীন পোশাক, সাধারণত সাদা বা সাদামাটা রং |
| মাথা | খোলা রাখতে হবে | চুল ঢাকা থাকবে |
| মুখ | — | মুখে কাপড় লেগে থাকবে না। নিকাব বা মুখে লেগে থাকা বোরকা পরা যাবে না, তবে পরপুরুষ থেকে আড়াল করতে মুখ থেকে দূরে কাপড় ঝুলিয়ে রাখা যায় |
| পায়ের জুতা | পায়ের পাতার ওপরের উঁচু অংশ ও গোড়ালির হাড় ঢাকে না এমন স্যান্ডেল বা চপ্পল | সাধারণ জুতা-মোজা ব্যবহার করা যায় |
ইহরাম পরার আগে প্রস্তুতি
কমপক্ষে দুই সেট ইহরামের কাপড় রাখুন, যাতে একটি ধোয়ার দরকার হলে অন্যটি পরা যায়। সাথে নিন সুগন্ধিমুক্ত সাবান, চাদর ধরে রাখার বেল্ট ও খোলা স্যান্ডেল। ইহরামের পর নখ ও লোম কাটা নিষিদ্ধ, তাই বাঁধার আগেই এসব পরিষ্কার করে নিন। পুরো জিনিসপত্রের তালিকা পাবেন হজে যা নিতে হবে লেখায়।
ইহরাম বাঁধার ধাপসমূহ
- পরিচ্ছন্নতা: নখ ও অপ্রয়োজনীয় লোম পরিষ্কার করে গোসল বা অন্তত ওযু করুন।
- পোশাক পরা: পুরুষরা ইহরামের চাদর পরুন। নারীরা নিজেদের শালীন পোশাকে প্রস্তুত হোন।
- দুই রাকাত নামাজ: মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে মাথা ঢেকে ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন।
- নিয়ত: মনে মনে হজ বা উমরাহর নিয়ত করুন এবং মুখে বলুন। যেমন উমরাহর জন্য: “আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ফাইয়াসসিরহা লি ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নি।”
- তালবিয়া: নিয়তের পর তালবিয়া পড়া শুরু করুন।
তালবিয়া
“লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।”
অর্থ: আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা ও নিয়ামত আপনারই এবং রাজত্বও আপনার, আপনার কোনো শরীক নেই।
পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিম্নস্বরে তালবিয়া পড়বেন। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ শুরু করার আগ পর্যন্ত বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করা উত্তম।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
- সুগন্ধি ব্যবহার (ইহরামের আগে শরীরে লাগানো সুগন্ধির বিষয়ে আলেমের মত জেনে নিন), সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা তেল
- চুল বা নখ কাটা
- পুরুষের জন্য সেলাই করা পোশাক পরা ও মাথা ঢাকা
- নারীর জন্য মুখে লেগে থাকা নিকাব ও হাতমোজা
- স্ত্রী সহবাস, এ বিষয়ক কথাবার্তা ও ঘনিষ্ঠতা
- ঝগড়া-বিবাদ, গালাগালি ও গুনাহের কাজ
- স্থলের প্রাণী শিকার করা বা হারামের গাছ কাটা
এগুলোর কোনোটি ঘটে গেলে ক্ষতিপূরণ (দম বা সদকা) আসতে পারে। ভুল হলে কী করতে হবে তা আলেম বা হজ গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন।
যা ইহরামে জায়েজ
- গোসল করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা (সুগন্ধিমুক্ত সাবান)
- ছাতা ব্যবহার করা
- ঘড়ি, আংটি বা টাকা রাখার বেল্ট ব্যবহার করা
- ইহরামের কাপড় বদলানো বা ধোয়া
বিমানে ইহরাম পরার ব্যবহারিক পরামর্শ
ঢাকা থেকে সরাসরি জেদ্দাগামী ফ্লাইটে মীকাতের আগেই নিয়ত করতে হয়, তাই বিমানে ওঠার আগে গোসল বা ওযু সেরে ইহরামের কাপড় পরে নেওয়া সুবিধাজনক। ভিড়ের মধ্যে বিমানের ভেতরে প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন। চাদর যাতে খুলে না যায়, সে জন্য বেল্ট দিয়ে বেঁধে নিন। ঠান্ডা লাগলে পুরুষরা কম্বল গায়ে জড়াতে পারেন, তবে মাথা ঢাকবেন না। নিয়ত ও তালবিয়া শুরুর সঠিক সময় ক্রুদের ঘোষণা ও আপনার গাইডের নির্দেশনা থেকে জেনে নিন।
ইহরাম পরার সময় সাধারণ ভুল
- নিয়ত ছাড়া মীকাত পার হওয়া: ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করলে ক্ষতিপূরণের মাসআলা আসতে পারে। ফ্লাইটে ঘুমিয়ে না পড়ে ঘোষণার দিকে খেয়াল রাখুন।
- শুধু কাপড় পরলেই ইহরাম হয়েছে ভাবা: নিয়ত ও তালবিয়া ছাড়া শুধু সাদা চাদর পরলে ইহরাম শুরু হয় না।
- সুগন্ধি ব্যবহার: ইহরামের পর সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা লোশন ব্যবহার করা।
- মেজাজ হারানো: ভিড় ও ক্লান্তিতে রাগ করা ইহরামের আদবের পরিপন্থী।
আরও দেখুন উমরাহ পালনে সাধারণ ভুল।
সাধারণ প্রশ্ন
নারীদের মাসিক চলাকালে ইহরাম বাঁধা যাবে কি? হ্যাঁ, ইহরাম বাঁধতে পারবেন। তবে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাওয়াফ করা যাবে না। মাসআলা জেনে নিন।
ইহরামে ঘুমানো বা কাপড় বদলানো যাবে কি? হ্যাঁ, কোনো সমস্যা নেই।
ইহরাম বাঁধার পর কি আবার নিয়ত লাগবে? না, এক নিয়তেই হজ বা উমরাহ শুরু হয়ে যায়। তবে কাজের ধাপে ধাপে দোয়া ও নিয়ত মনে রাখা ভালো।
মীকাত কী? মীকাত হলো মক্কায় প্রবেশের আগে হজ বা উমরাহর নিয়তকারীর জন্য নির্ধারিত সীমা, যেখানে ইহরাম ছাড়া অতিক্রম করা যায় না। বাংলাদেশ থেকে জেদ্দাগামী বিমানযাত্রীরা সাধারণত ইয়ালামলামের বরাবর ইহরাম বাঁধেন।
নিয়ত মুখস্থ না থাকলে কী করব? নিয়ত মূলত অন্তরের বিষয়। প্রচলিত দোয়া মুখস্থ না থাকলে নিজের ভাষায় উমরাহ বা হজের নিয়ত করা যায়, তবে যাত্রার আগে দোয়াটি শিখে নেওয়া ভালো।
ইহরাম অবস্থায় ঘড়ি বা চশমা পরা যাবে কি? হ্যাঁ, ঘড়ি ও চশমা ব্যবহারে সমস্যা নেই। নারীদের ইহরাম নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন মহিলাদের হজ গাইড লেখায়।
- হজ ও উমরাহের পার্থক্য
- তাওয়াফ কীভাবে করবেন
- হজ প্রশিক্ষণ ২০২৭
- উমরাহ প্যাকেজ
- উমরাহ প্যাকেজ নভেম্বর ২০২৬ — স্ট্যান্ডার্ড (১৩ রাত)
- সাফা মারওয়া সাঈ গাইড
লেখক: নাজমুস শাকেব, ম্যানেজিং পার্টনার, আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (হজ লাইসেন্স HL ৬২৫)। মক্কায় বেড়ে ওঠা, ঢাকা থেকে হজ-উমরাহ যাত্রীদের সেবায় যুক্ত। আমাদের সম্পর্কে
দ্রষ্টব্য: এটি সাধারণ নির্দেশনা। নির্দিষ্ট মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা হজ গাইডের পরামর্শ নিন। দাবিত্যাগ
আল-সাফওয়া (HL ৬২৫) — যোগাযোগ
নাজমুস শাকেব: 01714-075291 | 01974-075291
হানিফ: 01670-787633 | 01919-787633
অফিস: 01552-600854