হজের প্রকার: তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ — পার্থক্য ও কোনটি কার জন্য

হজের প্রকার — তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ

হজের প্রকার কয়টি এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য কী? হজ তিন প্রকারে আদায় করা যায়: তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ। এই লেখায় তিনটির সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও কোনটি কেমন হাজির জন্য সুবিধাজনক তা ধাপে ধাপে বলা হলো।

১. তামাত্তু হজ

  • হজের মাসে (শাওয়াল থেকে জিলহজ) প্রথমে উমরাহর ইহরাম বাঁধা হয়।
  • উমরাহ সম্পন্ন করে ইহরাম খুলে ফেলা হয়।
  • ৮ জিলহজ নতুন করে হজের ইহরাম বাঁধা হয়।
  • তামাত্তুকারীর ওপর হাদি (পশু কুরবানি) আদায় করতে হয়।

২. কিরান হজ

  • একই ইহরামে উমরাহ ও হজ দুটোর নিয়ত করা হয়।
  • উমরাহ শেষ হলেও ইহরাম খোলা যায় না; ১০ জিলহজ পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকতে হয়।
  • কিরানকারীর ওপরও হাদি ওয়াজিব।

৩. ইফরাদ হজ

  • শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়; আলাদা উমরাহ থাকে না।
  • ইফরাদে হাদি ওয়াজিব নয়; তবে আদায় করলে নফল হিসেবে সওয়াব পাওয়া যায়।

তিন প্রকারের তুলনা

  • উমরাহ: তামাত্তুতে আলাদা, কিরানে একসাথে, ইফরাদে নেই।
  • ইহরাম খোলা: তামাত্তুতে উমরাহর পর খোলা যায়; কিরান ও ইফরাদে হজ পর্যন্ত খোলা যায় না।
  • হাদি: তামাত্তু ও কিরানে ওয়াজিব; ইফরাদে ওয়াজিব নয়।

কোনটি উত্তম?

এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ তামাত্তুকে, কেউ কিরানকে উত্তম বলেছেন। বাস্তবে সফরের সময়সূচি, শারীরিক সামর্থ্য ও গ্রুপের পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।

কাদের জন্য কোনটি সুবিধাজনক?

  • মক্কায় আগেভাগে পৌঁছে বেশি দিন থাকলে তামাত্তুতে ইহরাম থেকে মুক্ত অবস্থায় বিশ্রামের সুযোগ মেলে।
  • ইহরামের নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ সময় মানতে পারলে কিরান বেছে নেওয়া যায়।
  • নিজের হজ-সফর আলাদা উমরাহ ছাড়াই সংক্ষিপ্ত রাখতে চাইলে ইফরাদ বিবেচনা করা যায়।

প্রশ্নোত্তর

হাদি কী?

হজের সময় তামাত্তু ও কিরানকারীর ওপর যে পশু কুরবানি ওয়াজিব হয়, তাকে হাদি বলে। এটি মিনায় কুরবানির দিনগুলোতে আদায় করা হয়।

হাদি দিতে না পারলে কী করণীয়?

সামর্থ্য না থাকলে রোজা রাখার বিধান আছে। নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন।

আমি কোন প্রকার করব তা কীভাবে ঠিক হয়?

আপনার গ্রুপের পরিকল্পনা ও সময়সূচি দেখে লিডার ও আলেমের পরামর্শে ঠিক করুন।

প্রতিটি প্রকারে নিয়তের ধরন

  • তামাত্তু: প্রথমে শুধু উমরাহর নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। উমরাহ শেষে ইহরাম খুলে ৮ জিলহজ হজের জন্য নতুন নিয়ত করা হয়।
  • কিরান: একই ইহরামে উমরাহ ও হজ — দুটির নিয়ত করা হয়।
  • ইফরাদ: শুধু হজের নিয়ত করা হয়, আলাদা উমরাহ থাকে না।

সময়সূচির দিক থেকে পার্থক্য

তামাত্তুতে উমরাহ ও হজের মাঝখানে ইহরামমুক্ত থাকার সময় পাওয়া যায়। এই সময়টা হজ-পূর্ব প্রস্তুতি, বিশ্রাম ও ইবাদতে ব্যবহার করা যায়। কিরানে ইহরাম অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকতে হয়, যা নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার দিক থেকে কিছুটা কঠিন। ইফরাদে হজের নির্ধারিত দিনগুলোর আগে সময় কম লাগে বলে সংক্ষিপ্ত সফরে সুবিধাজনক হতে পারে।

সাধারণ কিছু ভুল ধারণা

  • অনেকে মনে করেন ইফরাদে আলাদা কোনো আমল কম থাকে বলে সেটি সহজ। বাস্তবে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার সময় ও সফরের সময়সূচি ভিন্ন হয়।
  • তামাত্তু মানে হজ হালকা — এটি ভুল। হজের মূল আমল সব প্রকারেই একই।
  • হাদি শুধু ধনীদের জন্য — এটি ভুল ধারণা। যাদের ওপর হাদি ওয়াজিব, সামর্থ্য না থাকলে বিকল্প বিধান আছে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা জিজ্ঞেস করবেন

  • আমাদের গ্রুপের ফ্লাইট ও সময়সূচি কোন প্রকারের জন্য সুবিধাজনক?
  • মক্কায় আগে পৌঁছালে কতদিন আগে পৌঁছাব?
  • হাদির ব্যবস্থা কীভাবে হবে এবং খরচ কত?
  • শারীরিক সামর্থ্য ও বয়স বিবেচনায় কোনটি উপযোগী?

বাংলাদেশি হাজিরা সাধারণত কোন প্রকার করেন

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বেশিরভাগ হাজি তামাত্তু হজ করেন। এর কারণ ব্যবস্থাপনাগত, ধর্মীয় নয়: বাংলাদেশি হজ ফ্লাইট সাধারণত হজের অনেক আগে সৌদি আরবে পৌঁছায়। কেউ মক্কায় আগে যান, কেউ মদিনায় ৮ দিনের সফর শেষে মক্কায় আসেন। দুই ক্ষেত্রেই হজের দিনগুলোর আগে অনেকটা সময় হাতে থাকে।

এই দীর্ঘ সময় ইহরাম অবস্থায় কাটানো কঠিন — সুগন্ধি, সেলাই করা কাপড়, চুল-নখ কাটা সবই নিষিদ্ধ থাকে। তামাত্তুতে উমরাহ শেষ করে ইহরাম খুলে ফেলা যায়, তারপর ৮ জিলহজ নতুন করে হজের ইহরাম বাঁধা হয়। তাই দীর্ঘ সফরের জন্য এটাই সবচেয়ে ব্যবহারিক।

আপনার প্যাকেজে কোন প্রকার ধরা হয়েছে, সেটা বুকিংয়ের সময়ই জেনে নিন — কারণ এর ওপর হাদির খরচ নির্ভর করে।

হাদি কীভাবে আদায় হয় — বাস্তব ব্যবস্থা

তামাত্তু ও কিরানকারীর ওপর হাদি ওয়াজিব। বাস্তবে আজকাল প্রায় কেউই নিজে হাতে পশু কেনেন না। সৌদি আরবে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কুপন বা ব্যাংকের স্লিপ কিনে হাদি আদায় করা হয়; নির্দিষ্ট দিনে তারা কুরবানি সম্পন্ন করে।

  • বেশিরভাগ এজেন্সি হাদির ব্যবস্থা প্যাকেজের ভেতরে বা আলাদা খরচ হিসেবে করে দেয় — বুকিংয়ের সময় কোনটা তা স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করুন।
  • কুপনের রসিদ সংগ্রহে রাখুন।
  • অননুমোদিত কারও হাতে টাকা দিয়ে হাদির দায়িত্ব দেবেন না।

সামর্থ্য না থাকলে হাদির বদলে রোজার বিধান আছে — হজের দিনগুলোতে কয়েকটি ও দেশে ফিরে বাকিগুলো। সঠিক সংখ্যা ও সময় মাযহাবভেদে ভিন্ন, তাই নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে নিজের অবস্থা বলে জেনে নিন।

নিয়ত করার পর প্রকার বদলানো যায় কি?

একবার নির্দিষ্ট প্রকারের নিয়তে ইহরাম বেঁধে ফেললে ইচ্ছেমতো বদলানো যায় না; কিছু ক্ষেত্রে বদলালে দম বা অন্য বিধান এসে যেতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন কোনো কারণে উমরাহ সম্পন্ন করা সম্ভব না হওয়া) কী করণীয় তার আলাদা বিধান আছে। নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঙ্গে থাকা আলেম বা গ্রুপ গাইডকে পুরো পরিস্থিতি খুলে বলুন।

তিন প্রকারের খরচে পার্থক্য

হজের প্রকার সরাসরি প্যাকেজের দাম ঠিক করে না — হোটেল, ফ্লাইট ও সফরের দৈর্ঘ্যই মূল খরচ। তবে একটি স্পষ্ট পার্থক্য আছে: তামাত্তু ও কিরানে হাদির খরচ যোগ হয়, ইফরাদে হয় না। বাংলাদেশি প্যাকেজে যেহেতু প্রায় সবাই তামাত্তু করেন, তাই হাদির খরচ ধরা আছে কি না সেটা দেখে নেওয়া দরকার। একইভাবে মিনা-আরাফায় তাঁবুর ক্যাটাগরি ও মক্কার হোটেলের দূরত্ব — এ দুটিই দামের বড় অংশ নির্ধারণ করে।

সংক্ষেপে মনে রাখার কথা

  • তামাত্তু = আলাদা উমরাহ, মাঝে ইহরামমুক্ত সময়, হাদি ওয়াজিব।
  • কিরান = এক ইহরামে দুটোই, মাঝে ইহরাম খোলা যায় না, হাদি ওয়াজিব।
  • ইফরাদ = শুধু হজ, হাদি ওয়াজিব নয়।
  • বাংলাদেশি দীর্ঘ প্যাকেজে তামাত্তুই সবচেয়ে ব্যবহারিক।
  • কোন প্রকার করবেন, তা একা ঠিক না করে গ্রুপের আলেম ও লিডারের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

সবচেয়ে ভালো হয় আগে থেকে একজন নির্ভরযোগ্য আলেম ও অভিজ্ঞ গ্রুপ লিডারের সঙ্গে কথা বলে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া।

হজ ও উমরাহ সম্পর্কে আরও জানতে বা প্যাকেজের তথ্যের জন্য আল-সাফওয়া ট্রেড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (লাইসেন্স HL 625)-এর অফিসে যোগাযোগ করুন। ১৯৯৯ সাল থেকে ৫,৭০০+ হাজিকে সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হোমআমাদের সম্পর্কেসেবাসমূহ🕋 হজ্জ প্যাকেজ☪ রমজান প্যাকেজ🌙 উমরাহ প্যাকেজযোগাযোগ📝 ব্লগ
.........
Scroll to Top